আমাশয় আমাদের দেশে খুব পরিচিত একটি পেটের সমস্যা। অনেকে পায়খানার
সঙ্গে আম বা শ্লেষ্মা গেলে, পেট কামড়ালে, বারবার বাথরুমে যেতে হলে একে
আমাশয় বলেন। সাধারণ আমাশয় অনেক সময় কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে
যায়। কিন্তু একই ধরনের সমস্যা যদি বারবার হয়, দীর্ঘদিন থাকে, অথবা
ভালো হওয়ার পর আবার ফিরে আসে, তখন মানুষ একে সাধারণভাবে “পুরাতন
আমাশয়” বলে থাকেন।
তবে মনে রাখা জরুরি,
পুরাতন আমাশয় নিজে একটি
নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। এটি একটি উপসর্গভিত্তিক ধারণা। এর পেছনে
জীবাণু সংক্রমণ, পরজীবী সংক্রমণ, অন্ত্রের প্রদাহ, পাইলস-ফিশার, এমনকি
কিছু গুরুতর রোগও থাকতে পারে। তাই দীর্ঘদিন পায়খানার সমস্যা থাকলে
শুধু ঘরোয়া চিকিৎসা বা বারবার একই ওষুধ খেয়ে যাওয়া ঠিক নয়। এই
ব্লগে আমরা পুরাতন আমাশয় এর লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত
জানব।
বাংলাদেশে “পুরাতন আমাশয়” বলতে সাধারণত এমন একটি
অবস্থাকে বোঝানো হয় যেখানে রোগীর দীর্ঘদিন ধরে পায়খানার সঙ্গে আম বা
শ্লেষ্মা যায়, পেট কামড়ায়, বারবার পায়খানার চাপ আসে, কিন্তু ঠিকমতো
পায়খানা হয় না। কারও কারও ক্ষেত্রে রক্তও যেতে পারে। আবার কেউ বলেন,
সকালে কয়েকবার বাথরুমে যেতে হয়, পেট পরিষ্কার মনে হয় না, খাবার
খেলেই পেট মোচড় দেয়।
এই সমস্যা যদি ২–৩ সপ্তাহের বেশি থাকে, বারবার ফিরে আসে, অথবা ওজন কমা,
রক্তপাত, জ্বর, দুর্বলতা, রাতের বেলায় পায়খানা, বা ক্ষুধা কমে
যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা যাবে না।
পুরাতন আমাশয়ের সাধারণ লক্ষণ
পুরাতন আমাশয় দীর্ঘদিন চলতে থাকলে রোগীর পায়খানার ধরন, পেটের
অস্বস্তি ও দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবন—সবকিছুতেই প্রভাব ফেলতে পারে। কারও
ক্ষেত্রে লক্ষণ হালকা থাকে, আবার কারও ক্ষেত্রে রক্ত, আম বা বারবার
পায়খানার চাপ দেখা যায়। তাই সাধারণ লক্ষণগুলো আগে থেকে জানা জরুরি।
পুরাতন আমাশয়ের একটিমাত্র কারণ নেই। অনেক কারণে একই ধরনের লক্ষণ দেখা
দিতে পারে। তাই কারণ না জেনে চিকিৎসা করলে সমস্যা সাময়িকভাবে কমলেও
আবার ফিরে আসতে পারে।
১. জীবাণু সংক্রমণ
দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর খাবার, রাস্তার খাবার, অপরিষ্কার হাত বা
সংক্রমিত ব্যক্তির মাধ্যমে অন্ত্রে জীবাণু ঢুকতে পারে। Shigella জাতীয়
ব্যাকটেরিয়া ডায়রিয়া, পেটব্যথা, জ্বর ও রক্তযুক্ত পায়খানার কারণ
হতে পারে। অনেক হালকা সংক্রমণ বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত তরল গ্রহণে ভালো হলেও
গুরুতর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক লাগতে পারে।
২. পরজীবী সংক্রমণ
অনেক সময় আমাশয়ের পেছনে অ্যামিবা বা অন্য পরজীবী সংক্রমণ থাকে।
অপরিষ্কার পানি, খাবার বা সঠিক স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে এ ধরনের
সংক্রমণ হতে পারে। এতে পায়খানার সঙ্গে আম, পেটব্যথা, অস্বস্তি এবং
মাঝে মাঝে রক্ত যেতে পারে।
৩. অসম্পূর্ণ বা ভুল চিকিৎসা
অনেকে আমাশয় হলেই দোকান থেকে ওষুধ কিনে খান। কারও কারও ক্ষেত্রে
অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করে মাঝপথে বন্ধ করে দেন। এতে সমস্যা পুরোপুরি
সারে না। আবার ভুল অ্যান্টিবায়োটিক খেলে ভবিষ্যতে ওষুধের কার্যকারিতা
কমে যেতে পারে। তাই পায়খানায় রক্ত বা দীর্ঘদিনের আম থাকলে চিকিৎসকের
পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া ঠিক নয়।
৪. অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ
সব পুরাতন আমাশয় সংক্রমণের কারণে হয় না। Ulcerative colitis বা
Crohn’s disease-এর মতো inflammatory bowel disease বা IBD থাকলেও
দীর্ঘদিন ডায়রিয়া, পেটব্যথা, রক্তপাত, দুর্বলতা ও ওজন কমার মতো লক্ষণ
দেখা দিতে পারে।
৫. ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম বা IBS
IBS থাকলে পেট মোচড়ানো,
গ্যাস, পাতলা পায়খানা বা কোষ্ঠকাঠিন্য পালা করে হতে পারে। অনেক সময়
পায়খানার সঙ্গে সাদা মিউকাসও যেতে পারে। তবে IBS-এ সাধারণত রক্তপাত,
জ্বর বা দ্রুত ওজন কমা থাকে না। এসব থাকলে অন্য কারণ খুঁজতে হয়।
৬. পাইলস, ফিশার বা মলদ্বারের সমস্যা
কখনো রোগী মনে করেন তার পুরাতন আমাশয় হয়েছে, কিন্তু আসলে সমস্যা থাকে
মলদ্বারে। পাইলস বা
ফিশারের কারণে পায়খানার সঙ্গে
রক্ত, ব্যথা, জ্বালা বা অস্বস্তি হতে পারে। আবার দীর্ঘদিন চাপ দিয়ে
পায়খানা করলে মলদ্বারের সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
৭. খাদ্যাভ্যাস ও পানি দূষণ
অপরিষ্কার পানি, অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার, বাসি খাবার,
অস্বাস্থ্যকর বাইরের খাবার, অনিয়মিত খাওয়া এবং কম পানি পান করার
অভ্যাস পেটের সমস্যা বাড়াতে পারে। এগুলো সরাসরি সবসময় পুরাতন আমাশয়
তৈরি না করলেও অন্ত্রের সংবেদনশীলতা বাড়ায়।
৮. কোলোরেক্টাল ক্যান্সার
পুরাতন আমাশয় বা দীর্ঘস্থায়ী আমাশয়ের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ
হচ্ছে কোলোরেক্টাল ক্যান্সার। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে পেটের সমস্যা, পাতলা
পায়খানা বা মলের সাথে রক্ত যাওয়াকে সাধারণ আমাশয় বা পাইলস ভেবে
অবহেলা করেন, যা পরবর্তীতে মারাত্মক রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে ৪০ বছরের
বেশি বয়সে যদি কারো নিয়মিত পেটের সমস্যা, ওজন কমে যাওয়া,
ক্ষুধামন্দা বা মলত্যাগের অভ্যাস পরিবর্তন হয়, তাহলে অবশ্যই
কোলোনোস্কোপি করে পরীক্ষা করা উচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত করা গেলে
কোলোরেক্টাল ক্যান্সার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য, তবে দেরি হলে চিকিৎসা
জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
পুরাতন আমাশয়ের চিকিৎসা পদ্ধতি
পুরাতন আমাশয়ের চিকিৎসা কারণভেদে আলাদা। শুধু লক্ষণ দেখে একই ওষুধ
সবার জন্য দেওয়া যায় না। কারণ সংক্রমণ, IBD, IBS, পাইলস বা মলদ্বারের
সমস্যা—প্রতিটির চিকিৎসা আলাদা।
১. পানি ও খাবার ব্যবস্থাপনা
ডায়রিয়া বা বারবার পায়খানা হলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বের হয়ে যায়।
তাই পর্যাপ্ত পানি, খাবার স্যালাইন এবং সহজপাচ্য খাবার খুব জরুরি।
গুরুতর পানিশূন্যতায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে শিরায় স্যালাইন লাগতে
পারে।
২. সংক্রমণ থাকলে সঠিক ওষুধ
যদি পরীক্ষায় ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবী সংক্রমণ ধরা পড়ে, তাহলে চিকিৎসক
প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ দেবেন। এখানে নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক
খাওয়া উচিত নয়। ভুল ওষুধে রোগ চাপা পড়ে যেতে পারে, আবার পরে সমস্যা
আরও জটিল হতে পারে।
৩. অন্ত্রের প্রদাহ থাকলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা
Ulcerative colitis বা
Crohn’s disease থাকলে
চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। এতে নিয়মিত ওষুধ, ফলোআপ, খাবারের
নিয়ন্ত্রণ এবং কখনো endoscopy/colonoscopy দরকার হতে পারে। এসব রোগে
মাঝে মাঝে রোগ কমে, আবার flare-up হতে পারে।
৪. IBS হলে জীবনযাপন পরিবর্তন
IBS থাকলে রোগীকে খাবারের ধরন, মানসিক চাপ, ঘুম, পানি পান, নিয়মিত
হাঁটা এবং নির্দিষ্ট খাবারের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতে হয়। সবার জন্য
একই খাদ্যতালিকা কাজ করে না। কারও দুধে সমস্যা হয়, কারও ঝাল-মসলা বা
অতিরিক্ত চা-কফিতে পেট খারাপ হয়।
পাইলস, ফিশার, ফিস্টুলা বা রেকটাল সমস্যা থাকলে সেগুলোর চিকিৎসা দরকার।
শুধু আমাশয়ের ওষুধ খেলে এসব সমস্যা ভালো হবে না। বরং দেরি করলে ব্যথা,
রক্তপাত বা ইনফেকশন বাড়তে পারে।
পুরাতন আমাশয় হলে কী খাবেন এবং
কী খাবেন না?
পুরাতন আমাশয় হলে খাবার বাছাই করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় এমন খাবার
খাওয়া ভালো, যা সহজে হজম হয়, পেটের অস্বস্তি কমায় এবং শরীরের
পানি-লবণের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে। আবার কিছু খাবার আছে, যেগুলো
পেটের সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
যা খেতে পারেন:
ভাত
নরম খিচুড়ি
স্যুপ
ডাবের পানি
কলা
সেদ্ধ আলু
টক দই, যদি সহ্য হয়
পর্যাপ্ত পানি
খাবার স্যালাইন
যা এড়িয়ে চলা ভালো:
রাস্তার খাবার
বাসি খাবার
অতিরিক্ত ঝাল
অতিরিক্ত তেল
কাঁচা বা অপরিষ্কার সালাদ
শাক
অনিরাপদ পানি
অতিরিক্ত চা-কফি
কোমল পানীয়
পুরাতন আমাশয়ের ঘরোয়া চিকিৎসা
পুরাতন আমাশয় দীর্ঘদিন থাকলে শুধু ঘরোয়া উপায়ে নির্ভর করা ঠিক নয়।
তবে খাবার, পানি, বিশ্রাম ও স্বাস্থ্যবিধি ঠিক রাখলে উপসর্গ কিছুটা
কমতে পারে এবং শরীর দুর্বল হওয়া থেকে রক্ষা পায়। রক্ত, জ্বর, বেশি
পেটব্যথা বা দীর্ঘদিনের সমস্যা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
উচিত।
নিরাপদ পানি পান করুন
খাবার আগে ও টয়লেটের পর হাত ধুয়ে নিন
খাবার ঢেকে রাখুন
পচা বা বাসি খাবার খাবেন না
খাবার স্যালাইন রাখুন
নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না
পায়খানায় রক্ত থাকলে দেরি করবেন না
একই সমস্যা বারবার হলে পরীক্ষা করুন
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?
কিছু লক্ষণ দেখা দিলে পুরাতন আমাশয়কে সাধারণ পেটের সমস্যা মনে করে
অবহেলা করা ঠিক নয়। বিশেষ করে রক্তপাত, জ্বর, তীব্র পেটব্যথা বা
দীর্ঘদিন পায়খানার সমস্যা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পায়খানার সঙ্গে রক্ত যায়
২ সপ্তাহের বেশি আম বা পাতলা পায়খানা থাকে
জ্বর থাকে
পেটের ব্যথা বেশি হয়
বারবার বমি হয়
শরীর পানিশূন্য লাগে
ওজন কমে যায়
ক্ষুধা কমে যায়
রাতে ঘুম ভেঙে পায়খানায় যেতে হয়
বয়স ৪০ বছরের বেশি এবং নতুন করে রক্তপাত শুরু হয়
পায়খানা ক্লিয়ার হয় না
পরিবারে কোলন বা রেকটাল ক্যান্সারের ইতিহাস থাকে
পুরাতন আমাশয়ে কোলোরেক্টাল স্পেশালিস্ট
ডাঃ তারিক আখতার খান এর পরামর্শ নিন
পুরাতন আমাশয়, পায়খানার সঙ্গে রক্ত বা মিউকাস, পাইলস, ফিশার,
ফিস্টুলা, রেকটাল সমস্যা বা বৃহদান্ত্রের রোগ নিয়ে লজ্জা পাওয়ার কিছু
নেই। সময়মতো চিকিৎসা নিলে অনেক সমস্যাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
আপনার যদি দীর্ঘদিন ধরে পায়খানার সমস্যা থাকে, বারবার আম যায়, বা
রক্তপাত হয়, তাহলে অভিজ্ঞ কলোরেক্টাল সার্জন
ডাঃ তারিক আখতার খান এর পরামর্শ নিতে পারেন। সঠিক রোগ
নির্ণয় হলে চিকিৎসাও অনেক সহজ হয়।
সব ক্ষেত্রে বিপজ্জনক নয়। তবে দীর্ঘদিন মিউকাস, রক্ত, পেটব্যথা
বা ওজন কমার সমস্যা থাকলে পরীক্ষা করা জরুরি। কারণ এর পেছনে
সংক্রমণ, অন্ত্রের প্রদাহ, কলোরেক্টাল ক্যান্সার বা অন্য রোগ
থাকতে পারে।
সবসময় নয়। মিউকাস সংক্রমণ, IBS, IBD, মলদ্বারের সমস্যা,
ক্যান্সার বা অন্য কারণেও যেতে পারে। লক্ষণ বারবার হলে চিকিৎসকের
পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সব ক্ষেত্রে লাগে না। সংক্রমণের ধরন বুঝে চিকিৎসক
অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া
ঠিক নয়।
রক্ত গেলে দেরি না করে ডাক্তার দেখানো উচিত। পাইলস বা ফিশারেও
রক্ত যেতে পারে, আবার অন্ত্রের প্রদাহ, ক্যান্সার বা অন্য গুরুতর
কারণও থাকতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে খাবার নিয়ন্ত্রণে উপসর্গ কমে। তবে যদি সংক্রমণ,
IBD, ক্যান্সার বা মলদ্বারের রোগ থাকে, তাহলে শুধু খাবার
নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়। সঠিক চিকিৎসা দরকার।
সতর্কতাঃ
ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যসমূহ শুধুমাত্র সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
আজই পুরাতন আমাশয়ের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন!
দীর্ঘদিনের পেটের সমস্যা, রক্ত বা আম যাওয়ার অস্বস্তি কমাতে সঠিক
চিকিৎসা শুরু করুন!